বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

মধুচে

মধুচে

বিজ্ঞাপন
বর্ষা থেমে গেছে, কিন্তু মাটির ভেজা ভেজা ভাবটা এখনো রয়ে গেছে। বাতাসে কাঁঠালপাতার মৃদু গন্ধ, আর দূরে বাঁশঝাড়ের মাথায় হালকা রোদ। গ্রামের পুরোনো পথ ধরে হাঁটলে দেখা যায় বুড়ো মধুচাষি হাজি করিমকে—চোখে শান্তি, মুখে একধরনের স্থিরতা। দেখে মনে হয় যেন মৌমাছিদের গুঞ্জনের মধ্যেই পৃথিবীর সব কথা শুনে ফেলে।
হাজি করিমের বয়স অনেক, কিন্তু চলাফেরায় এখনো বেশ চটপটে। গ্রামের মানুষ তাকে সম্মান করে। কারণ সে শুধু মধু বিক্রিই করে না—যেন মধুর ভেতর মানুষের মনও পড়তে পারে। তার কাছে মধু হলো একধরনের দর্শন।

এই গ্রামেই থাকে রাশেদ—চুপচাপ এক যুবক। নিজের ভেতর তার আছে একধরনের অস্থিরতা। তার চোখে যেন সব সময় একটা ক্ষুধা—সম্মানের ক্ষুধা। সে দরিদ্র, কিন্তু তার স্বপ্ন দরিদ্র নয়। সে চায় মানুষ তাকে দেখুক, চিনুক, সম্মান করুক।
হাজি করিমের মধুর দাম কিন্তু বেশি। শহর থেকে লোকেরা এসে কিনে নিয়ে যায়। রাশেদের মনে হয়, এত মধু, এর থেকে ছোট এক বয়াম নিয়ে নিলে কী আর এমন ক্ষতি হবে? বুড়ো টেরই পাবে না। নিজেকে সে বোঝায়—আমি দরিদ্র, মা অসুস্থ। আমার মতো লোক কিছু নিয়ে নিলে কিসের অন্যায়? লোভ এভাবে গোড়ার দিকে যুক্তির মুখোশ পরে আসে। আর সেই মুখোশ খুব সহজেই মানুষকে ভুল পথে টেনে নিয়ে যায়।

চাঁদহীন এক রাতে রাশেদ নিঃশব্দে হাজি করিমের বাগানে ঢুকে পড়ে। মৌচাকের কাছে যেতেই সে বুঝতে পারল—মধু শুধু মিষ্টি নয়, মধু চুরিতে ভীষণ ঝুঁকি। মৌমাছিরা গুঞ্জন তুলছিল ঠিকই, কিন্তু সে সাবধানে হাত বাড়িয়ে দ্রুত বয়াম ভরে ফেলল। মৌচাকের গভীরে সে হাত দেয়নি। তা ছাড়া রাতের ঠান্ডায় মৌমাছিরা কম সক্রিয় থাকে। অপরিচিত গন্ধ হলে তারা সাধারণত আক্রমণ করে না—শুধু সতর্ক হয়ে যায়। তাই রাশেদকে তারা কামড়ায়নি।
ফিরে আসার সময় রাশেদের মনে হলো—এটা তো খুব সহজ। আরেক দিন আরও নেব। লোভের দ্বিতীয় টান আসে আত্মবিশ্বাসের পোশাকে।

দ্বিতীয় রাতেও সে একইভাবে চুরি করল। এবার আরেকটু বড় বয়াম ভরল। মৌমাছিরা গুঞ্জন তুলল, কিন্তু সে ভয় পেল না। দ্রুত কাজ করে পালিয়ে গেল। মানুষ যখন নিজের ভুলকে ন্যায্যতা দিতে শুরু করে, তখনই বিপদ সবচেয়ে কাছে থাকে।
তৃতীয় রাতে হাজি করিম অপেক্ষা করছিল। রাশেদ মৌচাকের কাছে যেতেই বুড়ো বলল, ‘মধু চুরি করা যায়, কিন্তু মধুর গন্ধ চুরি করা যায় না।’ রাশেদ স্থির হয়ে গেল। মৌমাছির গুঞ্জন যেন তার বুকের ভেতর ঢুকে পড়ল।

হাজি করিম তাকে মারল না। শুধু বলল, ‘চুরি করলে মধু তেতো হয়ে যায়। সেই সাথে মানুষও। তুমি কি তেতো মানুষ হতে চাও?’ রাশেদ থ মেরে গেল।
পরদিন গ্রামের সবাই জানল। মানুষ হাসল, কেউ গাল দিল। রাশেদের মা চুপ করে রইলেন—চোখে শুধু একটা প্রশ্ন, ‘তুই কেন?’ রাশেদ নিজেকে ছোট মনে করল। সম্মান হারানোর যন্ত্রণা তাকে ভেতর থেকে ছিঁড়ে ফেলল।

কয়েক দিন পর হাজি করিম তাকে ডেকে বলল, ‘চুরি করে তেতো হয়ে যাচ্ছ। কিন্তু কাজ করলে মিষ্টি হতে পারো। চাইলে আমার সঙ্গে কাজ করতে পারো।’ রাশেদ লজ্জায় মাথা নিচু করল। তবু রাজি হলো।
কাজের প্রথম দিনই সে বুঝল—চুরি করা সহজ, কিন্তু কাজ করা কঠিন। মৌচাক পরিষ্কার করতে গিয়ে তার হাত কেটে গেল। দ্বিতীয় দিন মৌমাছি তাকে দংশন করল। তৃতীয় দিন সে বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়ল।
সে ভাবল—চুরি করতে গেলে তো মৌমাছি কামড়ায়নি। তাহলে এখন কেন? হাজি করিম বলল, ‘যখন চুরি করতে গেছ, মৌমাছি তোমাকে চেনে না, তাই আক্রমণ করে না। কাজ করতে গেলে তোমাকে কাছে যেতে হয়। মৌমাছি তোমাকে চিনতে শেখে। চেনার সময় তারা পরীক্ষা করে—দংশন করে। ভালো পথে ফিরতে গেলে কষ্ট হয়। ভুল পথে গেলে কষ্ট হয় না।’

রাশেদ ধীরে ধীরে শিখতে লাগল। মৌমাছিরা তাকে চিনতে শুরু করল। ফুলের গন্ধ তার কাছে নতুন অর্থ পেল। কোন ফুলে বেশি মধু হয়, কোন ফুলে গন্ধ নরম, কোন ফুলে মৌমাছি বেশি যায়—সবকিছু সে নতুন চোখে দেখতে লাগল।

মধু তৈরি করতে করতে সে বুঝল—মধু হলো ধৈর্য, মধু হলো পরিশ্রম, মধু হলো সততা।
একদিন শহর থেকে এক ক্রেতা এল। রাশেদের তৈরি মধু চেখে বলল, ‘এটা তো করিম সাহেবের মধুর থেকেও ভালো।’ গ্রামের মানুষ তাকিয়ে রইল। রাশেদের চোখে জল এসে গেল।
হাজি করিম হাসল, ‘দেখেছ? মধু মানুষকে বদলে দেয়।’

গ্রামের মানুষও বদলে গেল। তারা দেখল—রাশেদ চুরি করেছে ঠিকই, কিন্তু সে বদলেছে। পরিশ্রম করছে। মধু ভালো বানাচ্ছে। হাজি করিম তাকে গ্রহণ করেছে। তাই গ্রামও তাকে গ্রহণ করল।
বয়স্করা বলল, ‘ভুল করলে মানুষ খারাপ হয় না। ভুল থেকে যে শেখে, সে-ই ভালো মানুষ।’
রাশেদের মা তাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘তুই আবার আমার ছেলে হয়ে ফিরেছিস।’ রাশেদের বুক ভরে গেল।

সন্ধ্যায় রাশেদ মৌচাকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। মৌমাছিরা গুঞ্জন তোলে—আজ সেই গুঞ্জন তার কাছে ভয়ের নয়, বরং আশীর্বাদ। সে জানে—মানুষ ভুল করে, লোভে পড়ে, অপমানিত হয়—কিন্তু মানুষ বদলাতে পারে। মধুর মতোই—তেতো থেকে মিষ্টি হওয়া যায়।
(একটি বিদেশি গল্প অনুসরণে)

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz